তুরস্কে গেলো লাভলু’র রোবটিক হাত!

১৩ মার্চ, ২০২২ ১৬:১৩  
অবিকল সুস্থ মানুষের হাতের মতো নড়াচড়া করছে কব্জি ও আঙুলগুলো। ইচ্ছেমতো, যে কোনো দিকে ঘোরানো যাচ্ছে, করা যাচ্ছে মুষ্টিবদ্ধও। এমন কি এক লিটারের বোতল ধরতে এবং পানি পানের জন্য মুখের কাছে নিয়ে যেতে পারছে স্বাভাবিক ভাবেই। এটি আসল হাত কিংবা আঙুল নয়। কিশোর লাভলুর তৈরি ‘রোবোটিক্স হ্যান্ড বা রোবোটিক হাত’। এরই মধ্যে প্লাস্টিক আর সিলিকনে তৈরি সাশ্রয়ী এই কৃত্রিম একটি হাত রপ্তানি হয়ে গেছে এশিয়া-ইউরোপের সেতুপথ তুরস্কে। সেখানকার রেহানলি জেলার হাতায় প্রভিন্সের ইয়ানিক মাহ’র জন্য এই হাতটি বায়না করেছিলেন তার চিকিৎসক নিহাত কুরুল কাড। ফেসবুকে লাভলুর পেজ থেকে। গেলো সপ্তাহে তা পাঠিয়েও দিয়েছে লাভলু। দামে সাশ্রয়ী হওয়ায় এরই মধ্যে ভারত, মায়নামার, ইতালি ও মালোয়েশিয়া থেকেও বায়না পেয়েছেন তিনি। তবে এর আগে একই ধরনের আরো একটি হাত লাভলু বিক্রি করেছেন বগুড়ার কৌশিক রায়ের কাছে। কনুই পর্যন্ত হাত না থাকা কৌশিক এখন অনেকটাই স্বাভাবিক জীবন যাপন করছেন রোবটিক হাতের সাহায্যে। চট্টগ্রামের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে ইলেকট্রনিক্স ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে অধ্যয়নরত লাভলুর পুরো নাম জয় বড়ুয়া লাভলু। ঘরে ব্যবহৃত রেডিও কিংবা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক্স যন্ত্র নষ্ট হলে তা নিজেই খুলে ঠিক করতেন লাভলুর আসবাব মিস্ত্রি বাবা রবি বড়ুয়া। তাকে দেখেই ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ার সময় থেকে উদ্ভাবনে আগ্রহী ওঠে সে। জোবরা গ্রামে বসেই চলে এটা সেটা উদ্ভাবনে কসরৎ। হাতের পাতা নেই, কনুই থেকে হাত নেই কিংবা জন্মগতভাবে হাতই নেই- এমন মানুষের কষ্ট স্পর্শ করে ছোট্ট লাভলুকে। ২০১৭ সালের দিকে হাত তৈরির বিষয়টা তার মাথায় আসে। ভাবতে ভাবতে মেধা আর পরিশ্রম দিয়ে একসময় সত্যিই তৈরি করে ফেললেন রোবটিক হাত। শুধু বায়োনিক হাতই নয়; এরই মধ্যে বানিয়েছেন হোম ক্লিনিং রোবট। কৃষক সহায়তায় উদ্ভাবন করেছেন উভয়চর রোবট, রোবটিক থার্ড হ্যান্ড, ওয়্যারলেস হ্যান্ড, ইএমজি কন্টোল রোবটিক হ্যান্ড, হেড মেসেজ ডিভাইজ, এলিন ওয়ান ফিউচার কার, রোপ ক্যামেরা, ওয়্যারলেস ক্যামেরা, কথা বলা রোবট, রোবটিকস মুখ। এসব কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৯ সালে নাসা স্পেস অ্যাপ চ্যালেন্জে চট্টগ্রাম হতে প্রথম স্থান অর্জন করে লাভলু ও তার দল। এছাড়াও এসো রোবট বানাই টিভি শো তে এগরিকালচার রাউন্ড হতে ২য় স্থান অর্জন করে লাভলু। ইলেকট্রনিক্স সেফটি অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের উদ্যোগে আয়োজিত বঙ্গবন্ধু আর্ন্তজাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত ‘আবিষ্কারের খৌঁজে’ নামক প্রতিযোগিতায় ফার্স্ট রানারআপের পুরস্কার পান লাভলু। এছাড়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত প্রতিযোগিতা, চট্টগ্রাম ও হাটহাজারিতে স্থানীয়ভাবে আয়োজিত বিজ্ঞান মেলা ও বিজ্ঞান প্রতিযোগিতায় কয়েকটি পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। কেবল পুরস্কার পেয়েই তুষ্ট নয় লাভলু। কাজ করতে চান মানবতার কল্যাণে। তাই নিজের উদ্ভাবনগুলো বাণিজ্যিকভাবে বাজারে আনতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। দেশেই রোবটিয়ান ক্যারিয়ার গড়তে এখন ঢাকার রায়ের বাজারে স্থাপন করেছেন রোবটিক ল্যাব। সেখান থেকেই চলছে গবেষণা-উদ্ভাবন এবং সীমিত পরিসরের উৎপাদন কার্যক্রম। এই কাজ এগিয়ে নিতে প্রত্যাশা করছেন রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার। চলতি বছরকে প্রযুক্তি পণ্য বর্ষ ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সঠিক পৃষ্ঠোপোষকতা পেলে হয়তো আমাদের লাভলুরাই মেড ইন বাংলাদেশ এর পতাকা উড়িয়ে এই ঘোষণাকে বাস্তবায়ন করবে নিভৃতেই।